রিপন কান্তি গুণ, নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি/
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের 'ব্যাংক এশিয়ার' অনলাইন ব্যাংকিং শাখার ক্যাশিয়ার সানোয়ার হোসেন সাগরের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের ৩০ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সাগরের উধাও হওয়ার খবর পেয়ে সম্প্রতি ১৭ আগষ্ট মো. বজলুর রহমান নামে এক ভুক্তভোগী গ্রাহক ক্যাশিয়ার সানোয়ার হোসেন সাগরের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছেন।
ক্যাশিয়ার সাগর মোহনগঞ্জ উপজেলার সমাজ সহিলদেও ইউনিয়নের সহিলদেও গ্রামের মঞ্জিল মিয়ার ছেলে। তিনি ওই ইউনিয়নে 'ব্যাংক এশিয়া' শাখায় অনলাইন ব্যাংকিং সিস্টেমে ক্যাশিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোহনগঞ্জ উপজেলার সাত ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে শাখা খুলে ব্যাংক এশিয়া গরীব মানুষদের ব্যাংকিং সেবা দেয়ার জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে। প্রতি ইউনিয়নের উদ্যোক্তারা অনলাইনে শাখা পরিচালনা করেন। মূল ব্যাংক থেকে উদ্যোক্তার নামেই শাখা পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়।
সমাজ-সহিলদেও ইউনিয়নের 'ব্যাংক এশিয়া' শাখা অফিসের অবস্থান মোহনগঞ্জ পৌরশহরের পাথরঘাটা এলাকায়। ব্যাংকটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ইউনিয়নের উদ্যোক্তা সাইদুল ইসলাম রাসেল। এছাড়াও উক্ত শাখাটিতে ম্যানেজার হিসেবে মাকসুদ রানা, অ্যাকাউন্টের দায়িত্বে মুন এবং ক্যাশিয়ার পদে কর্মরত রয়েছেন সানোয়ার হোসেন সাগর। পরিচালক ছাড়া এ শাখায় কর্মরত ওই তিনজনই নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা দিয়ে থাকেন। তবে মাকসুদ রানা শুধু সমাজ-সহিলদেও ইউনিয়ন শাখার ম্যানেজারই নন, তিনি সবগুলো শাখার ম্যানেজারের দায়িত্ব সামলান।
ভুক্তভোগী, স্থানীয় লোকজন ও ব্যাংকে কর্মরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রাহক ও পরিচিতদের কাছ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা নিয়ে গত ৮ আগস্ট এলাকা ছেড়ে চলে যায় ক্যাশিয়ার সাগর।
পৌরশহরের টেংগাপাড়ার বাসিন্দা স্কুল শিক্ষিকা জাকিয়া সুলতানা জানান, তার স্বামীর পেনশনের টাকাসহ সংসারের জমানো টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে জমা ছিল। সেখান থেকে তুলে গত আগস্ট মাসের শুরুতে ব্যাংক এশিয়ার সমাজ-সহিলদেও শাখায় তিন দফায় মোট ২২ লাখ টাকা জমা রাখেন। ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থাকা সাগর ওই শিক্ষিকার অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে সব কাজ করে দে়ন।
তিনি বলেন, প্রথমে আমি ৮ লক্ষ টাকা জমা রাখি। সেগুলো ব্যাংকে ঠিকঠাক মত জমা হয়। পরে দুই দফায় ১৪ লাখ টাকা জমা করি। সেগুলো ব্যাংকের জমা দেয়ার রশিদে নাম ঠিকানা লিখে টাকা সাগরের কাছে দিয়ে আসি। এরমধ্যে একদিন রাতে সাগর তার ব্যাংকের ল্যাপটপ নিয়ে আমাদের বাসায় এসে বলে হেড অফিসে তথ্য পাঠাতে হবে এখানে আঙ্গুলের ছাপ দিন। আমি সরল বিশ্বাসে দিলাম। পরে তার মোবাইল সমস্যা বলে আমার মোবাইলটা নিয়ে কার সঙ্গে কথা বলে বাসা থেকে চলে যায়। এর দুইদিন পর ব্যাংকে গিয়ে জানলাম সে আমার ১৪ লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমা দেয়নি, জমা হওয়া আট লাখ টাকাও তুলে নিয়ে পালিয়েছে সাগর।
তিনি আরও বলেন, পরে থানায় অভিযোগ করেছি। এখনো সাগরকে ধরতে পারেনি পুলিশ। ব্যাংকে টাকা রাখতে গেলে যদি এমন হয় তাহলে মানুষ কোথায় যাবে?
ব্যাংকের পরিচালক ও ইউনিয়ন উদ্যোক্তা সাইদুল ইসলাম রাসেল বলেন, ব্যাংকে তো আমি তেমন বসি না। ওই তিনজনই চালায়। কিভাবে কি হয়েছে সেটা সাগরকে খুঁজে পাওয়া গেলেই জানা যাবে। তবে লেনদেনের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সতর্ক হতে হবে।
ব্যাংক ম্যানেজার মাকসুদ রানা বলেন, ব্যাংকের গ্রাহকের ও তার ব্যক্তিগত লেনদেনের সব মিলিয়ে ৩০ লাখ টাকার মত নিয়ে গেছে সাগর। এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে বা তুলে নিলে মোবাইলে ম্যাসেজ যায়। আমাদের পুরো সিস্টেমটাই ডিজিটাল। এখন সাগরকে পাওয়া গেলে সব পরিষ্কার হবে।
সমাজ-সহিলদেও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম খান সোহেল বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রমে কোন সমস্যা হয়নি। ব্যাংকে চেক করে দেখা হয়েছে- ওই দম্পতি আট লাখ টাকা জমা করেছিলেন। পরে আবার সেই টাকা তারা তুলে নিয়েছেন। সাগর যেহেতু পলাতক রয়েছে তাই কি ঘটেছে সঠিক বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, পলাতক থাকায় টাকা নিয়ে পালিয়েছে বলেই সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে। সাগরের পরিবারকেও চাপ দেয়া হয়েছে তাকে খুঁজে বের করে দিতে। এদিকে পুলিশও তাকে খুঁজছে। সাগর বের হলেওই পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হবে। তবে সচেতন পরিবার হিসেবে টাকা জমা হওয়া বা তুলে নেয়ার ব্যাপারে মোবাইলের ম্যাসেজ দেখে নিশ্চিত হওয়া উচিত ছিল তাদের।
এ ব্যাপারে কথা বলতে অভিযুক্ত সাগরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে কল করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহনগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শুভ্র দে বলেন, তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় সাগরকে ধরতে চেষ্টা চলছে। তার অবস্থান একবার ঢাকায়, আরেকবার নারায়ণগঞ্জে শনাক্ত হয়েছে। ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন করছে সাগর। আশা করছি দ্রুতই তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।