
বদরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:
একসময় ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রামবাংলার প্রান্তরে ভেসে আসত গরুর ঘণ্টার ঝংকার, কৃষকের সুরেলা হাঁকডাক “হ্যাঁ গরু, চলো মাঠে।” হাতে লাঙল, কাঁধে জোয়াল, পাশে একজোড়া বলিষ্ঠ গরু নিয়ে মাঠের পথে যেতেন কৃষক। ছিল প্রাণচঞ্চল এক গ্রামীণ জীবনের চিত্র। আজ সেই দৃশ্য প্রায় বিলুপ্ত। গরু দিয়ে হালচাষ এখন ইতিহাসের পাতায়, স্মৃতির অ্যালবামে সীমাবদ্ধ।প্রযুক্তির অগ্রগতি ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণের কারণে গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। গরু দিয়ে হালচাষের জায়গা নিয়েছে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার। একসময় যেখানে সকালে মাঠে নামতেন শত শত কৃষক, এখন সেখানে কয়েক মিনিটেই মেশিনে চাষ হয়ে যাচ্ছে একর পর একর জমি। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে গরু, লাঙল আর কৃষকের সেই চিরচেনা সুর।রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি স্থানে এখনো দেখা মেলে গরুর হালচাষের। লোহানীপাড়া ইউনিয়নের বিলপাড়া, সাঁওতাল বড়পাড়া ও কাঁচাবাড়ী গ্রামে এখনো টিকে আছে ঐতিহ্যের শেষ নিদর্শন। সেখানে মাত্র পাঁচটি গরুর হাল রয়েছে যারা আজও নিজেদের জীবিকা ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
বিলপাড়ার কৃষক মতিন মিয়া এখনো গরু দিয়ে হালচাষ করেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে হালচাষ করছি। গরু, লাঙল, জোয়াল এগুলোই ছিল আমাদের জীবনের অংশ। গরু দিয়ে হালচাষ করলে জমির মাটি নরম হয়, ঘাস কম জন্মে, আর গরুর গোবর জমিতে পড়ে সার হিসেবে কাজ করে। ফসলও ভালো হয়। তার ছেলে মাইদুল মিয়াও (২৫) এখনো বাবার পাশে থেকে ঐতিহ্য রক্ষায় অনড়। সে বলে,আমাদের এই পেশা অনেক কষ্টের, কিন্তু তৃপ্তিরও। মেশিন দিয়ে চাষে সময় বাঁচে ঠিকই, কিন্তু গরুর হালচাষের মতো মাটির গন্ধ আর আনন্দ কোনো মেশিনে নেই। কুতুবপুর ইউনিয়নের কৃষক আজহারুল ইসলাম বলেন,আমার জীবনের সিংহভাগ সময় কেটেছে গরুর পালে, লাঙল-জোয়ালের সঙ্গে। গরু দিয়ে হালচাষ করলে জমির ঘাস কম হতো, জমির উর্বরতা বাড়ত, আর গোবরের কারণে জমি হতো জৈব সারসমৃদ্ধ। অন্য এক কৃষক আলী হোসেন বলেন,এখন আর আগের সেই পরিবেশ নেই। মেশিনে চাষ দ্রুত হয়, কিন্তু গরু দিয়ে চাষ করার যে আবেগ আর ঐতিহ্য, তা হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সন্তানেরা হয়তো আর জানবেও না লাঙল-জোয়াল কী!
স্থানীয় শিক্ষক এনামুল হক মনে করেন, গরু দিয়ে হালচাষ ছিল সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষিপদ্ধতি। তিনি বলেন, গরু দিয়ে হালচাষ করলে মাটির গঠন নষ্ট হতো না, কোনো কার্বন নির্গমনও ছিল না। কষ্টসাধ্য হলেও এতে প্রকৃতি বেঁচে থাকত, কৃষকের সঙ্গে মাটির সম্পর্ক অটুট থাকত। বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ বলেন, কৃষিতে শ্রমিক সংকট এবং উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কারণে সরকার কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করেছে। এখন অধিকাংশ কৃষক পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর ব্যবহার করছেন। এতে সময় ও খরচ দুই-ই কমছে। তবে আমরা কৃষকদের পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির দিকেও উৎসাহ দিচ্ছি।স্থানীয় প্রবীণ কৃষকদের মতে, যান্ত্রিকতার ফলে চাষাবাদ সহজ হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছেকিন্তু গ্রামীণ জীবনের সৌন্দর্য হারিয়েছে। ভোরবেলার গরুর ঘণ্টাধ্বনি, মাটির গন্ধে ভরা চাষের মাঠ আর কৃষকের কণ্ঠে উৎসবমুখর হালচাষসবকিছুই এখন শুধু স্মৃতির অংশ।গ্রামের মানুষ আজও বলেন, যান্ত্রিকতার যুগে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেই সরল, মাটির গন্ধমাখা জীবন যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। গরু দিয়ে হালচাষ শুধু একটি পদ্ধতি ছিল না, এটি ছিল আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জীবনের প্রাণ।






















এই post বিষয়ে আলোচনা করুন