প্রিন্ট এর তারিখঃ এপ্রিল ১৯, ২০২৬, ১০:৪৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জানুয়ারী ২৪, ২০২৬, ১১:০২ পি.এম
গাইবান্ধা-০৫ আসনের নির্বাচনী মূল ইস্যু নদী ভাঙ্গন রোধ ও চর উন্নয়ন

মেহেদী হাসান বাবু (ব্যুরো প্রধান) গাইবান্ধা :
ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবিধৌত সংসদীয় আসন ৩৩,গাইবান্ধা-০৫ (সাঘাটা–ফুলছড়ি) আসনের সাধারণ মানুষের কাছে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে নদী ভাঙন রোধ ও চরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলিত উন্নয়ন। প্রতি বছর নদীভাঙনে বসতভিটা, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো মানুষ। ফলে এবার ভোটাররা এমন প্রার্থীই বেছে নিতে চান, যিনি এসব সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান দিতে পারবেন।সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ২৭৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৮১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৩ জন। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর দুই পাড়ের লাখো মানুষ বছরের পর বছর ধরে ভাঙা-গড়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ও পানি কমার সময় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি। সামর্থ্যবানরা বসতভিটা সরিয়ে নিতে পারলেও নিঃস্ব মানুষ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।অন্যদিকে, ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ বালুচরে বর্তমানে এক ধরনের কৃষি বিপ্লব ঘটেছে। অর্ধশতাধিক চরে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বাজারমূল্যের ২ লাখ টনের বেশি বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু এই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চরাঞ্চলে নেই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, হাসপাতাল কিংবা মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নাজুক; অধিকাংশ চরে নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি।ব্রহ্মপুত্র নদের কিছু কিছু জায়গায় লোক দেখানো বাঁধের প্রতিরক্ষা কাজ শুরু হলেও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাকি অংশগুলোতে প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ ভাঙন। স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকসই বাঁধ ও নদীশাসন পরিকল্পনার অভাবেই এই দুর্ভোগ বছরের পর বছর চলছেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও প্রত্যাশার শেষ নেই। ফুলছড়ি ইউনিয়নের মনোয়ার হোসেন ও মকসেদ আলী জানান, বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে তারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের আগলার চরের বাসিন্দা সাইদুর রহমান ও ফজলুপুর ইউনিয়নের লালু মিয়া চরাঞ্চলে পুলিশ ফাঁড়ি ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতাল স্থাপনের দাবি জানান। স্থানীয় বাসিন্দা আবু হাসেম বলেন, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার যিনি দেবেন, ভোটাররা তাকেই প্রাধান্য দেবেন।এমন বাস্তবতায় নির্বাচনী মাঠে ভোটারদের মন জয় করতে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার বলেন, নদীর তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীকে মানুষের অভিশাপ নয়, আশীর্বাদে পরিণত করা হবে। চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।জামায়াত মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ আলী জানান, তিনি নির্বাচিত হলে নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি চরাঞ্চলে পশুপালন কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবেন। এছাড়া বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত টানেল বা সেতু নির্মাণ এবং ট্যানারি ও জুট মিল স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।এদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী আলহাজ্ব নাহিদুজ্জামান নিশাদ নদীভাঙনকে সাঘাটা–ফুলছড়ি এলাকার অস্তিত্বের সংকট উল্লেখ করে বলেন, এটি আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়, বরং বাঁচা-মরার প্রশ্ন। তিনি নির্বাচিত হলে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ভাঙনকবলিত পরিবারদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।নিশাদ আরও বলেন, চরাঞ্চলের কৃষিকে আধুনিক ও লাভজনক করতে কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার, হিমাগার ও সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি বড় চরে পুলিশ ফাঁড়ি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাসেবা চালুর প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। পাশাপাশি দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত প্রশাসন, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চরাঞ্চলকে আলাদা উন্নয়ন অঞ্চলে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানান এই স্বতন্ত্র প্রার্থী।সব মিলিয়ে নদীভাঙন রোধ, চরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও নিরাপদ জীবনযাত্রাই গাইবান্ধা-০৫ আসনের ভোটারদের কাছে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিশ্বাসযোগ্যতা কাকে ভোটের মাঠে এগিয়ে রাখে।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৩ দেশ বাংলা প্রতিদিন