রিপন কান্তি গুণ, নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি /
নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় চুরির অপবাদে আবুলায়েছ নামের এক কিশোরকে আটক রেখে রাতভর শারীরিক নির্যাতনের পর সালিশে মাথা ন্যাড়া ও জরিমানা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী আবুলায়েছ সরাপাড়া গ্রামের বাক প্রতিবন্ধী দিনমজুর আব্দুস সালামের একমাত্র ছেলে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের এক ইউপি সদস্যসহ দুইজনকে আটক করেছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৮ আগস্ট) উপজেলার বলাইশিমুল ইউনিয়নের সরাপাড়া গ্রামে ঘটনাটি ঘটে। পরে (১১ আগস্ট) শুক্রবার ওই কিশোরের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা জানাজানি হয়।
বিষয়টি জানার পর কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাবেরী জালাল, কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলী হোসেন ও সাংবাদিকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান।
বিষয়টি জানাহানি হলে, সালিশের দুই মাতব্বর স্থানীয় ইউপি সদস্য সবুজ মিয়া ও গ্রাম্য মাতব্বর আবু তাহেরকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মারধরে অসুস্থ আবুলায়েছকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আজ (১২ আগস্ট) শনিবার দুপুরে কেন্দুয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ ফারাবী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ভুক্তভোগী আবুলায়েছ ঘটনার বিবরণীতে জানান, নিকটাত্মীয় অসুস্থ থাকায় খোঁজখবর নিতে সোমবার রাতে মা মোবাইলের মিনিট কার্ড কেনার জন্য গ্রামের সরাপাড়া বাজারে পাঠায়। তখন রাত প্রায় বারোটা বাজে। মিনিট কার্ড কেনার জন্য শাহীন মিয়া দোকানে গিয়ে ডাকাডাকির সময় পেছন থেকে চা দোকানি মতিউর আমাকে ঝাপটে ধরে চোর বলে চিৎকার করে। পরে ওই চা দোকানি গ্রাম ও বাজারের লোকজনকে ডেকে আনেন। তারপর ইউপি সদস্য সবুজ মিয়া, সাবেক মেম্বার হাদিস মিয়া, আবু তাহেরসহ আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে রাতভর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। মেরে বস্তায় ভরে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেয় তারা। এক পর্যায়ে গ্রাণ রক্ষায় চুরির বিষয়টি স্বীকার করতে বাধ্য হই।
বিষয়টি নিয়ে পরের দিন সকালে বাজারের ব্যবসায়ী ও গ্রামের মাতব্বরগণ সরাপাড়া বাজারে বসেন এক সালিশ বৈঠকে। এতে সভাপতিত্ব করেন বর্তমান ইউপি সদস্য সবুজ মিয়া। পরে বিচারের মাথা ন্যাড়া করে ১০টি বেত্রাঘাত ও দুই হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
আবুলায়েছের মা নুরেছা আক্তার জানান, বাজারে ১২টা-১টা পর্যন্ত দোকানপাট খোলা থাকে। এই ভেবে জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল মিনিট কার্ড আনার জন্য ছেলেকে বাজারে পাঠাই। কিছুক্ষণ পরেই খবর আসে তাকে চোর ভেবে আটক করেছে। তাৎক্ষণিক ছুটে যাই বাজারে। আমার কোনো কথাই তারা শোনেনি। রাতভর আমার ছেলেকে মারপিট করেছে। জান বাঁচানোর জন্য আমার ছেলে চুরির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। আমরা ভাঙা ঘরে থাকি। চালের ওপর পলিটিন দিয়ে ঢেকে রেখেছি। চুরির অপবাদ দিয়ে ছেলেটারে ইচ্ছামত মারধর করেছে তারা। বিচার করে মাথাডা ন্যাড়া করছে। তাই চোরের অপবাদে লজ্জায় মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারছি না। ৫ হাজার জরিমানা ধরলে কাকুতিমিনতি করে দুই হাজার টাকায় মানিয়েছি। তাও আরেকজনের কাছ থেকে ধার করে এনে টাকা দিয়েছি। টাকার জন্য ছেলে চিকিৎসা করাতে পারছি না। এই ঘটনার দুঃখে ক্ষোভে ও লজ্জায় ছেলেটা কারোর সঙ্গে কথা বলে না, ভাতও খায় না। আমার ছেলেটাকে সবুজ মেম্বার, হাদিস মেম্বার ও আবু তাহেরসহ কয়েকজনে মিলে মেরে শেষ করে দিয়েছে। আমি এই ঘটনার সঠিক বিচার চাই।
চা দোকানি মতিউর রহমান জানান, বাজারে প্রায়ই চুরি হয়। সেজন্য তিনি সর্তক থাকেন। টিনের শব্দ পেয়ে শাহীন মিয়ার ঘরে গিয়ে আবুলায়েছকে আটক করি। পরে সবাইকে খবর দেই। বিচারের রায়ে আমিও দুটি বেত্রাঘাত করেছি ঠিকই। তবে কষ্টে তার দুই চোখে পানি চলে এসেছিল বলে তিনি দাবি করেন।
মোবাইল দোকানি শাহীন মিয়া জানান, ঘটনার সময় তিনি দোকানে ছিলেন না। খবর পেয়ে বাজারে আসেন। তার দোকানের দরজায় তালা লাগানো ছিল। দোকান ঘরের বেড়ার একটি টিন খোলা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগী কিশোরের চাচা লাইচ উদ্দিন জানান, ভাতিজা আবুলায়েছকে চুরির অপবাদ দিয়ে মেরেছে। সালিশ বৈঠকের বিচারকারীরা ভাতিজার মাথা আমাকে ন্যাড়া করার হুকুম দেয়। চাচা হয়ে ভাতিজার মাথা আমি কেমনে ন্যাড়া করি। আমি আপত্তি জানালে, তারা নাপিত এনে মাথা ন্যাড়া করেছে। আমরা এখন এই লজ্জায় বাইরে যেতে পারি না। তারা প্রভাবশালী মানুষ।
কেন্দুয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ ফারাবী জানান, এ ঘটনায় ইউপি সদস্য সবুজ মিয়া ও আবু তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে। বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে বলে জানান তিনি।
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাবেরী জালাল বলেন, 'বিষয়টি শোনার পর থানার ওসি'কে সঙ্গে নিয়ে আমি ঘটনাস্থলে যাই। আমরা সবসময় শিশু-কিশোরদের মানবিক দিক দিয়ে দেখি। ওই কিশোরকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।' এ ঘটনায় যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে, জানিয়েছেন ইউএনও