
এস. এম. মনিরুজ্জামান মিলন, ঠাকুরগাঁও: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অসংখ্য ছাত্র-জনতা নিহত হওয়ার খবর শুনে অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন লিটন আলী। তবে আন্দোলনে না যাওয়ার জন্য নিষেধ করেছিলেন তাঁর মা। মায়ের বারণ না শুনে ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন। আর এ আন্দোলনে অংশ নেওয়াই কাল হলো লিটনের।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগের দিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট মিছিল নিয়ে ঠাকুরগাঁও শহরের কোর্ট চত্বর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এতে পুলিশের গুলিতে মারাত্মক ভাবে আহত হন লিটন। মাথা থেকে শুরু করে হাত, পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে শাতাধিক ছররা গুলি লাগে। সহপাঠীরা তাকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। কিন্তু তাদের চিকিৎসা দিলে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসে হামলা করবে এ ভয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাকে চিকিৎসা দেয়নি। পরে পাশের এক প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন লিটন।
আঠারো বছর বয়সী লিটন আলীর ইচ্ছা ছিলো লেখাপড়া শেষে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার। কিন্তু বর্তমানে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ব্যথায় বিছানায় কাতরাচ্ছেন। মাথায় ১৫টি এবং পুরো শরীরে আরও শতাধিক গুলি। এই যন্ত্রণায় কত দিন থাকতে হবে তাও তিনি জানেন না। তবে উন্নত চিকিৎসায় শরীর থেকে গুলিগুলো বের করা সম্ভব হলে তিনি স্বাভাবিক হবেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
এদিকে দরিদ্র পরিবারের পক্ষে কোনো রকমে প্রাথমিক চিকিৎসাগুলো করানো সম্ভব হলেও উন্নত চিকিৎসার অর্থ জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছেন। নিজেকে এখন অসহায় ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছেন না লিটন।
ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের মিলননগর এলাকার ইয়াকুব আলী ও লিলি বেগম দম্পতির তৃতীয় সন্তানের মধ্যে লিটন সবার ছোট। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি।মা অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করে সংসার চালায়। আর বাবা থেকেও তাদের দেখভাল করে না। অভাবের সংসারে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে লিটনও খণ্ডকালীন চাকরি করতেন একটি ওষুধ ফার্মেসিতে। সে চাকরিও এখন নেই।
লিটন সেই দিনের ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে জানান, ছাত্র আন্দোলনে ডাকা সব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। ৪ঠা আগস্ট দুপুরে কোর্ট চত্বরের পূর্ব পাশের গলিতে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়। এ সময় পুলিশ তাদের গুলি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বলে। কিন্তু তারা চলে যাওয়া শুরু করলে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এ সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। কিছু সময়ের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। পরে জ্ঞান ফেরার পর উঠে দাঁড়ালে তার খুব কাছে থেকে আবারও এলোপাতাড়ি ছররা গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত পুরো শরীর গুলিবিদ্ধ হন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাকেসহ গুলিবিদ্ধ অন্যদের ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। ছাত্রলীগ হামলা করতে পারে এ ভয়ে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করেন। আর চিকিৎসকরা সেদিন ঠিকমতো চিকিৎসা দেননি। পরে একটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচার করে ১২টি গুলি তার শরীর থেকে বের করা হয়। এর এক দিন পর (৬ আগস্ট) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। সেখানে তিন দিন চিকিৎসার পর রংপুর সিএমএইচ হাসপাতালে দুই সপ্তাহ ভর্তি ছিলেন। সেখানেও অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু শরীর থেকে একটি গুলিও বের করা সম্ভব হয়নি। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে এখন তিনি বাড়িতেই রয়েছেন।
লিটন বলেন, এখন সরকারের কাছে একটি চাওয়া আমার শরীর থেকে গুলিগুলো বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা যেন করা হয়। আবার আমি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে চাই। এই দেশের জন্য, আমার পরিবারের জন্য কাজ করতে চাই।
লিটনের মা লিলি বেগম বলেন, টানাটানির সংসারে ধারদেনা করে ছেলের জন্য ওষুধ কিনতে হচ্ছে। বড় স্বপ্ন ছিল ছেলেটা পড়ালেখা শেষ করে একদিন সংসারের হাল ধরবে। পরিবারের অভাব দূর হবে। কিন্তু আমাদের সাজানো স্বপ্ন এখন শেষ হয়ে গেল। সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ শিহাব মাহমুদ শাহরিয়ার জানান, প্রতিটি গুলি খুঁজে বের করা খুব ক্রিটিক্যাল এবং রোগী-ডাক্তার দুজনের জন্যই কষ্টকর। তবে কোনো গুলির কারণে শরীরে ইনফেকশন বা পুঁজ বের হয়, তখন সেটা আমরা বের করে চিকিৎসা দিই। তবে এত বেশি সংখ্যক গুলি বের করা প্রায় অসম্ভব।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন জানান, লিটনের খোঁজখবর নেয়া হয়েছে। তার সঙ্গে আমরা আছি। লিটন যাতে আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে সে ব্যবস্থা আমরা করবো।





















এই post বিষয়ে আলোচনা করুন