
তালুকদার মোঃ মাস্উদ,বরগুনা জেলা প্রতিনিধি /
আদিকাল থেকে মানুষ বিনোদন ও প্রকৃতির সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রমণ পিপাষু অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে বিধায় আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে মানবকুলে অনন্য অবদান রাখছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে আয় প্রায় ৭৯ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশে পর্যটন খাতে সরাসরি কর্মরত আছেন প্রায় ১৯ লাখ মানুষ। এ ছাড়াও পরোক্ষভাবে ২৮ লাখ। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০/৪২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা মত। বাংলাদেশ এখনো কাঙ্খিত লক্ষ্য অনুযায়ী পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন করতে পারেনি।দেখা যায় সিঙ্গাপুরের জাতীয় আয়ের পর্যাটন থেকে ৭৫, তাইওয়ানের ৬৫, ফিলিপাইনের ৫০ এবং থাইল্যান্ডের ৩০ শতাংশ অবদান রেখেছে । ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন অবদান রাখে ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্ব জিডিপিতে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ অবদান। পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার রোল মডেল। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য পর্যটনশিল্পের ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৪৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের (বিপিসি) গোড়াপত্তন হয়। ১৯৯২ সালে প্রণিত জাতীয় পর্যটন নীতিমালায় পর্যটনকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সে নীতিমালা হালনাগাদ করে ২০১০ সালে আরও যুগোপযোগী করা হয়। নীতিমালার পঞ্চম অধ্যায়ে এর বাস্তবায়নে গৃহীত প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পর্যটন আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়েছে,‘দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য উন্নত পর্যটন সেবা প্রদান এবং পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্নিষ্ট সকল সরকারি-বেসরকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশে নতুন ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং সময়ে সময়ে বিদ্যমান আইনসমূহ হালনাগাদকরণ।’কিন্তু ৭ বছর পার হলেও পর্যটন নীতি মালা বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপটি নেয়া হয় নি।
মহামারি করোনা, ডেঙ্গু সহ নানা বিধ সমস্যার কারণে বাংলাদেশে পর্যটনশিল্প বিকাশে প্রত্যাশিত অগ্রগতি সাধিত হয়নি।কোভিড-১৯ মহামারির কারণে পর্যটন শিল্পের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠার জন্য সরকার বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায় জড়িত পর্যটন অংশীজনদের সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। এছাড়াও, পর্যটন শিল্পের ক্ষতি চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের উপায় নির্ধারণের জন্য সমস্যা ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন, করোনাকালীন পর্যটন শিল্প পুনরায় চালুকরণের জন্য অনুসরণীয় নির্দেশিকা প্রস্তুত ও বিতরণ, অনুসরণীয় নির্দেশিকার উপর পর্যটন শিল্পের অংশীজনদের প্রশিক্ষণ প্রদান, ট্যুরিজম রিকোভারি প্ল্যান প্রস্তুতকরণ এসব কিছুই মনে হয় কাগজে কলমে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে রাষ্ট্রপতি নির্দেশনা রয়েছে। দেশের পর্যটন শিল্পে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, আমি আশা করি পর্যটন শিল্প জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে ভূমিকা রাখবে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। তিনি আরও বলেন, ভ্রমণ পিপাসু মানুষের নিত্য চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীজুড়ে গড়ে উঠেছে হাজারও পর্যটন কেন্দ্র। বর্তমানে বিশ্বে পর্যটন এক বৃহৎ অর্থনৈতিক খাত হিসাবে বিবেচিত। মানুষ মানুষে সম্প্রীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যটন শিল্প বিকাশে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি, মৎস্য উৎপাদন ও দেশের পর্যটন খাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এক্ষেত্রে বরগুনা পাথরঘাটার, তালতলী উপকূলীয় অঞ্চলও পিছিয়ে নেই। জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে যে ১৭টি লক্ষ্যের কথা বলেছে, তার মধ্যে তিনটি সরাসরি পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকি ১৪টিতেও কোনো না কোনোভাবে পর্যটনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ২০১৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যটন দিবস উপলক্ষে বরগুনা জেলার তালতলীর শুভ সন্ধ্যা, সদরের গোড়া পদ্মা, পাথরঘাটার হরিনঘাটা -বিহঙ্গদ্বীপ হয়ে সুন্দরবন—নতুন পর্যটন জোন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পর্যটন খাত আরও গতিশীল হবে। বর্তমানে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সুন্দরবন যেতে খুলনা – বাগেরহাট – মোংলা একমাত্র পথ দিয়ে যেতে হচ্ছে। বরগুনার তালতলী, গোড়াপদ্মা,পাথরঘাটা থেকে বিহঙ্গদ্বীপ হয়ে সুন্দরবনের পুর্বাঞ্চলের সঙ্গে নতুন সংযোগ তৈরি হলে পর্যটকদের জন্য সুবিধাজনক প্রকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে ।
দেশের সর্বদক্ষিণে বরগুনা জেলা একটি সম্ভাবনাময় । বিশ্বঐতিহ্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন ঘেষা বলেশ্বর, বিষখালী ও পায়রা নদী বেষ্টিত । বিষখালী,পায়রা ও বলেশ্বর নদে মোহনায় সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুভসন্ধ্যা ঝাউবন।বাতাসের ছোঁয়ায় প্রেমিকার উড়ন্ত চুলের মতো দুলছে ঝাউগাছগুলো। জন্ম থেকেই সমুদ্রের খোলা বাতাস ও বালু গায়ে মেখে ঝাউগাছগুলো এখন অনেক বড় হয়ে উঠেছে। সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ আর ঝাউগাছ এ যেন দৃষ্টিনন্দন এক সমুদ্র সৈকত শুভসন্ধ্যা ! সমুদ্রের মৃদু ঢেউ, বালুময় দীর্ঘ সৈকত আর ঝাউবনের সবুজ সমীরণের এ দৃশ্যটি যেন প্রকৃতি প্রেম। এ জেলায় দেখার মতে রয়েছে শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, সোনাকাটা ইকোপার্ক, গোড়াপদ্মা, সুরঞ্জনা, হরিণঘাটা, মোহনা পর্যটন কেন্দ্র, বিবিচিনি শাহী মসজিদ, বুকাবুনিয়া মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ, রাখাইন পল্লী, বেতাগি উপজেলার খ্রিস্টান পল্লী, কাউনিয়া জমিদার বাড়ি, নলটোনা গনকবর সিডর স্মৃতিস্তম্ভ, বিহঙ্গ দ্বীপ, নীলিমা পয়েন্ট, কালমেঘা পর্যটন কেন্দ্র, এছাড়াও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে মুজিব অঙ্গন, ইলিশ চত্বর,টাউন হল সংলগ্ন অগ্নিঝরা একাত্তর,সার্কিট হাউজ উন্মুক্ত ময়দান, নাথ পট্টি লেক, পাথরঘাটায় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, বিষখালী নদী ও সাগরের সাদের ইলিশ। প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে উপমহাদেশে একমাত্র জ্যোৎস্না উৎসব পালিত হয় প্রতি বছর এ জেলায় শুভসন্ধ্যায়। একদিকে সীমাহীন সাগর; আরেক দিকে দীর্ঘ ঝাউবন, তিন তিনটি নদীর বিশাল জলমোহনা। সব মিলিয়ে নদ-নদী আর বন-বনানীর ও ছোট সামুক এবং ঝিনুকের এক অপরূপ সমাহার।
এতো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটকের উন্নত সেবার জন্য দক্ষ ও মার্জিত জনবলের অভাব, উন্নত ও দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কার্যকরী ব্যবস্থার অভাব, ইলেকট্রনিক্স-প্রিন্ট মিডিয়া বাংলাদেশের পর্যটন অঞ্চলগুলোর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন না করা, প্রয়োজন মত প্রচার না করা, পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন না করা, বেসরকারি ও সরকারি উদ্যোগের দক্ষ গাইড এর অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন ব্যবস্থা, এছাড়া রয়েছে সামাজিক অনেক বাঁধা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া, কুয়াকাটা,গলাচিপা ও রাঙ্গাবালী এবং বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী ও পাথরঘাটা উপজেলাকে ঘিরে বিশেষ পর্যটনশিল্প গড়ে তুলতে পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। ‘পায়রা বন্দরনগরী ও কুয়াকাটা উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ-পর্যটনভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ণ’ নামে এই প্রকল্পটি ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে পরিকল্পনা কমিশন এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। বরগুনার স্থানগুলোকে ও পর্যটন কেন্দ্র করার প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোনার চরের ২০ হাজার ২৬ হেক্টর বিস্তৃত বনভূমিসহ ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতজুড়ে গড়ে তোলা হবে পর্যটন কেন্দ্র। এজন্য ‘পিপারেশন অব পায়রা-কুয়াকাটা রিজিনাল প্ল্যান’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। মূলত কুয়াকাটা, তালতলী ও বরগুনা সদর, পাথরঘাটা উপজেলার সমন্বয়ে পর্যটন জোন স্থাপন করা হবে। এ লক্ষ্যে চলতি সময় থেকে শুরু করে ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত চলছে সার্ভের কাজ।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উল্লিখিত পর্যটন প্রসার প্রয়োজন। অল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে সমবায় পর্যটন, কমিউনিটি বেইজড পর্যটন আরও সম্প্রসারিত করা সম্ভব । এ ছাড়া গ্রামের মানুষের মধ্যে মানবতাবোধ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহযোগিতা, একতা, সাম্য বৃদ্ধি পাবে যা বর্তমানে চলমান উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে তরান্বিত করে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সহযোগিতা করবে।
প্রয়োজনে ফরেন জোন এলাকা গড়ে তোলা। স্থানীয় পর্যায় উদ্যোক্তাদের উদ্ভুদ্ধ করণ, প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানসহ পর্যটন শিল্পকে আরও প্রসারিত করতে নতুন নুতন পদক্ষেপ গ্রহণ করা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বলয় রাখা, অবকাশ যাপনের জন্য হোটেল ও মোটেলগুলোতে প্যাকেজ কর্মসূচি রাখা, হোটেলগুলোতে পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থাও গাইডের ব্যবস্থা রাখা, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক-অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর, স্থলবন্দর, ট্রেন স্টেশন, বাস স্টেশন, পর্যটন কেন্দ্রগুলোর স্থির চিত্রের প্রয়োজনীয় দৃশ্য স্থির প্রদর্শনী গাইড লাইন রাখা ইত্যাদি।
বন ও পরিবেশ বিষয় চিন্তা এবং কৃষিবিদ তালুকদার মোঃ মাসুদ,সুশিল সমাজের ব্যক্তিরা বলেন আসুন সকলে মিলে বাংলাদেশটিকে বিশ্বের কাছে একটি সুন্দর দেশ হিসেবে পরিচিত করি, একটি পর্যটন দেশ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সম্মিলিতভাবে কাজ করি। দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই।
ইতোমধ্যেই জেলা প্রশাসক মোহাঃ রফিকুল ইসলাম কর্তৃক সমুদ্র সৈকত শুভ সন্ধ্যায় হোটেল মোটেলের ভিত্তি স্থাপন করে পর্যটকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহন করেছেন ।





















এই post বিষয়ে আলোচনা করুন