
কাশেম আহমেদ, মাগুরা জেলা প্রতিনিধি: স্বৈরাচারি আওয়ামীলীগের কিছু দলীয় ক্যাডারদের সমন্বয়ে মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলায় ১টি বিশেষ চক্র গড়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছু দিন ধরে এই চক্রটি উপজেলা পরিষদের পাশে দেশ প্রিন্টার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠানে বসে সাধারন মানুষকে ও উপজেলার অফিসারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে বলে অভিযোগ উঠে।
সাম্প্রতিক উপজেলা প্রকৌশলী নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে নিউজের পর থেকেই এই চক্রের অপকর্মের তথ্য প্রমান বের হতে শুরু হয়। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন অডিও ভিডিও তথ্য প্রমান আমাদের হাতে এসেছে।
উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের স্বামী কামরুল হাসান, সাবেক উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি শাসসুর রহমান, দেশ প্রিন্টার্স এর মালিক ও শামসুর রহমানের ভাগনী জামায় তরিকুল, তরিকুল এর সহযোগী ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের দুর্নীতির দায়ে বহিষ্কার হওয়া কর্মচারী ওবাইদুর এবং ধোয়াইলের ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান এই চক্রের সাথে জড়িত বলে তথ্য প্রমান পাওয়া যায়। এছাড়াও স্থানীয় আওয়ামীলীগের কিছু প্রভাবশালী নেতা এই চক্রের সাথে জড়িত আছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
মূলত বিভিন্ন আফিসে টেন্ডারবাজি করা, কে কোন টেন্ডার পাবে না পাবে সেটা আগে থেকেই নির্ধারন করা, দুর্বল ঠিকাদারদের টেন্ডারে অংশগ্রহন করতে বাধা দিয়ে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে কাজ ভাগাভাগি করে দেওয়া, টেন্ডার পাওয়ার সাথে সাথে কাজ পাওয়া ঠিকাদারের কাছ থেকে ৮-১০% অর্থ অগ্রিম নিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি, কাজ ২/৩ বার বিক্রি করে ইঞ্জিনিয়ার অফিসকে চাপ দিয়ে কম টাকায় কাজটি শেষ করানো ছাড়াও তাদের পছন্দের কাজগুলি উপজেলা প্রকৌশলীকে চাপ দিয়ে বাগিয়ে নেওয়া, অন্য কোনো ঠিকাদার কাজ পেলে সেখান থেকে টাকা বের করে দেওয়া ও প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজের অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিউজ করার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
সুনির্দিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জাইকার ১টি টেন্ডারে অংশগ্রহন করে আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান। তার নিজের লাইসেন্স না থাকায় তার ছোট ভাই রাজু এন্টারপ্রাইজের নামে ভুয়া সার্টিফিকেট বানিয়ে টেন্ডার দিয়ে ভেরিফিকেশনে ধরা পড়লে কাজ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে যায়, এছাড়া ভুয়া ডকুমেন্টস দাখিল করায়, ক্রয়বিধি অনুযায়ী লাইসেন্স নিষিদ্ধের বিষয়টি সামনে আসলে। এর পরেও কাজটি পেতে মরিয়া হয়ে পড়ে কামরুল। এরপর তিনি উপজেলা প্রকৌশলীকে চাপ প্রয়োগের ফলে লাইসেন্স নিষিদ্ধ না হলেও কাজটি পেতে ব্যর্থ হন। পরবর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাইকার টেন্ডারে পুনারায় অংশ নেয় কামরুলের নেতৃত্বধীন এই চক্রটি। তারা এ অর্থবছরে কাজ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুকে উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগ তোলে। যার প্রথম অভিযোগ ছিলো উপজেলা প্রকৌশলী ঠিকাদারদের মধ্যে কাজের বিষয়ে সমন্বয় করেন না। সংশ্লিষ্টদের মতে অভিযোগে মূলত কাজ ভাগাভাগিতে প্রকৌশলী সহযোগিতা করেননি এমনটাই বোঝাতে চেয়েছেন কামরুল। দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিষয়ে প্রকৌশলী মানহানির মামলা করতে থানায় গেলে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মামলা করতে ব্যর্থ হন প্রকৌশলী। পরে স্থানীয়রা বসে ভবিষ্যৎ তাদেরকে কাজ দিতে হবে বলে দাবী করলে প্রকৌশলী তাদের আশ্বস্ত করেন বলে জানা যায়। একই অর্থবছরে এডিপির প্রথম ধাপের টেন্ডার হলে ৫টি প্যাকেজ নিজেরা ভাগাভাগি করে নেন বলে জানা যায়। পরে টেন্ডার দাখিলে ভুলের কারণে কাজ পেতে ব্যর্থ হন কামরুল ও শামসুর। এরপর থেকে মরিয়া হয়ে উঠে চক্রটি। কামরুল ৭৫ হাজার ও শামসুর ৬৫ হাজার টাকা দাবি করে উপজেলা প্রকৌশলীকে মেসেজ দেন। না হলে তারা উপজেলা প্রকৌশলীকে হেনস্থা করবেন বলে ভয় দেখানোর অভিযোগ পাওয়া যায়।
(৩ জুলাই) ২০২৪ এ দেশ প্রিন্টার্স এর মালিক তরিকুল উপজেলা প্রকৌশলীকে একাত্তর টিভি ও কালবেলা পত্রিকার সাংবাদিক এর নাম করে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী দাবি করে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করে। তখন তিনি তাদের দাবি না মানায় তরিকুল ও তার সহযোগী ওবায়দুর দুজন মিলে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন অফিসারদের হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্নরকম দুর্নীতির অভিযোগ উল্লেখ করে মেসেজ দেন। এরপর উপজেলা প্রকৌশলীর কছে কমপক্ষে ৩ লক্ষ্য টাকা দিতে হবে বলে দাবি করেন অন্যথায় তাকে উপজেলা থেকে বদলির হুমকি দেয়।
তিনি বলেন, কামরুল এবং দুই ভাইস চেয়ারম্যান ও ঠিকাদার আলামিন সহ ৭-৮ জন এর পিছনে রয়েছেন বলে জানান।
উপজেলা প্রকৌশলী এসব কথোপকথন রেকর্ড করে মামলায় যেতে চাইলে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানরা ফেঁসে যাবেন ভেবে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিমাংসার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী এলজিইডি মাগুরা, ইউএনও, মহম্মদপুর, মাগুরা ও উপজেলা প্রকৌশলীকে অনুরোধ করলে তারা এধরনের কর্মকান্ড ভবিষ্যতে করবে না মর্মে মুচলেকার দেন।
এ ঘটনার পর চক্রটি আরো বেপরোয়া হয়ে ১৬ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী ঠিকাদারের সাইন নিয়ে টেন্ডারে অনিয়ম ও কাজে দুর্নীতির অভিযোগ তৈরি করে এলজিইডির প্রধান কার্যালয় ও অন্যান্য দপ্তরে মেইল করে দেন। অভিযোগ কারি ১৬ জন ঠিকাদারের মধ্যে প্রায় অধিকাংশই বর্তমান প্রকৌশলীর আমলে কোনো টেন্ডারে অংশগ্রহনই করেননি বলে তথ্য পাওয়া যায়। চক্রটি বিভিন্ন সাংবাদিককে দিয়ে যায় যায় দিন সহ বিভিন্ন পত্রিকায় উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নিউজ করেছেন। যেখানে উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্য না নিয়েই মনগড়া বক্তব্য ছাপানে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রটি এতেও ক্ষান্ত না হয়ে বিভিন্ন সাইটে গিয়ে সলিং ও রাস্তার ইট তুলে রাস্তার দৈর্ঘ্য কমের অভিযোগ করেছেন। এ ঘটনায় স্থানীয় সূত্রে জানা যায় ঐই ঠিকাদাররা পুনরায় কাজটি যাতে না করতে পারে এই ব্যাপারে স্থানীয়দেরকে উসকানি দিয়েছে।
এছাড়া শুক্রবার (৩০ আগস্ট) উপজেলার ঠাকুরের হাটে উপজেলা উন্নয়ন তহবিলের অর্থে ৬৭ হাজার ৯৯০ টাকা ব্যায়ে একটি টয়লেট নির্মিত হবার কথা হয়। চক্রটি স্থানীয় এলাকাবাসীকে বিভ্রান্ত করে বুঝিয়েছেন যে সেখানে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার টয়লেট নির্মিত হবার কথা হয়। বাকি টাকা উপজেলা প্রকৌশলী আত্মসাৎ করেছেন বলে স্থানীয়দের বোঝাতে সক্ষম হয়। এসব কথায় স্থানীয়দের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
চক্রটি নিজেরাই মানববন্ধনের ব্যানার প্রিন্ট করে এনে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারন মানুষকে এই সম্পর্কে ভুল বুঝিয়ে কাজ বন্ধ করার প্রতিবাদ করে মানববন্ধনের নামে তাদের ব্যানারের সামনে দাঁড় করে ছবি তুলে চলে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন বলেন, কতিপয় দুষ্কৃতিকারী পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণেদিত ভাবে সাংবাদিক পরিচয়ে এসে ব্যানার ধরিয়ে দিয়ে ছবি তুলে নিয়ে গেছে। এ বিষয়টি জানার পরে প্রকৌশল অফিসের লোকজন এসে মূল বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, এটা ১টা প্যাকেজের ৪টি কাজ মিলে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে টয়লেটের জন্য বরাদ্দ ৬৭ হাজার ৯৯০ টাকা হয়।
বাজার বনিক সমিতির সভাপতি আঃ সালাম বলেন, আসল ঘটনা জানার পর তাদেরকে ফোন দিলে তারা আর ফোন ধরে না, এরা এলাকার সাধারন মানুষকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চেয়েছিল। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানায়। এবিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা পরিষদের কয়েকজন অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই চক্রটি বহুদিন ধরে বিভিন্ন অফিসে বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ার অফিসে ও পিআইও অফিসে চাঁদাবাজি করে আসছে। টাকা না দিলেই বেপরোয়া হয়ে উঠে। বিষয়ে প্রশাসনের শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তার জানান। এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ সাদ্দাম হোসাইন বলেন, চক্রটি বহুদিন ধরেই খুবই বিরক্ত করে আসছে। এদের চাহিদা পূরন করতে না পারলেই অপপ্রচার ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলে। কিছু সাংবাদিক আমার বক্তব্য না নিয়েই সংবাদে তাদের মনগড়া বক্তব্য দিয়েছেন।
এই চাঁদাবাজি চক্রের ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার পালাশ মন্ডলের কাছে ফোনে জানতে চাইলে, তিনি সরাসরি এসে কথা বলার অনুরোধ করেন।




















এই post বিষয়ে আলোচনা করুন